•   Wednesday, 12 Jun, 2024

কাজে আসেনি ৬ কোটি টাকার প্রকল্প; সাড়ে ৮ কোটি টাকায় নতুন প্রকল্প

Generic placeholder image
  News Admin

প্রকৌশল সমাচার প্রতিবেদক: খুলনার ময়ূর নদ খননের নামে কয়েকবার প্রকল্প নিলেও সুফল মিলছে না। আবারো নদ চলে যাচ্ছে অবৈধ দখলদারদের হাতে। খুলনা নগরের অন্যতম
প্রবেশদ্বার গল্লামারী সেতু। ওই এলাকা দিয়েই নগরের কোলঘেঁষে বয়ে গেছে ময়ূর নদ, যা খুলনার হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত। তবে দখল ও দূষণে এখন যেন পেখম ছাঁটা ময়ূরের অবস্থা।
একসময়ের খরস্রোতা নদটি পরিণত হয়েছে মরা খালে। ময়ূর নদ রক্ষায় বারবার প্রকল্পও নেয়া হয়। প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে খনন করা হয়েছিল ২০১৪ সালে। তবে সে উদ্যোগ কাজে
আসেনি। তাই গত ডিসেম্বরে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আবারো নদটি খননের কাজ শুরু করেছে খুলনা সিটি করপোরেশন। পাশাপাশি ময়ূরকে ঘিরে নেয়া হয়েছে বেশকিছু
পরিকল্পনা। যদিও এর সুফল নিয়ে সংশয় রয়েছে নগরবাসীর।

গল্লামারী সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে যতদূর চোখ যায় কেবলই কচুরিপানা। সেতুর দুই প্রান্তে স্তূপ হয়ে আছে হরেক রকমের বর্জ্য। চোখ একটু স্থির করে দেখে বুঝে নিতে হয় ময়ূরের অস্তিত্ব।
নিচের কালো রঙের দূষিত পানি থেকে নাকে এসে ধাক্কা দেয় উৎকট গন্ধ। তাই নাক চেপে চলাচল করতে হয়। স্থানীয়রা জানান, আগে রূপসা নদীর সঙ্গে ময়ূরের সরাসরি সংযোগ
থাকলেও এখন সেটি বদ্ধ নদ। সময়ের বিবর্তনে একসময়ের স্রোতস্বিনী নদটি শ্রী ও গতি হারিয়ে এখন মরা খাল। পরিণত হয়েছে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে।

নদী গবেষকরা বলছেন, খুলনা শহরের পশ্চিম পাশ দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত গঙ্গা অববাহিকার পুরনো নদ ময়ূর মূলত ভৈরব নদের একটি স্রোতোধারা। এর দৈর্ঘ্য সাড়ে ১১
কিলোমিটারের মতো। স্থানভেদে ৪০ থেকে ১০০ ফুট প্রশস্ত এবং গভীরতা ১৫ থেকে ২৪ ফুট। তবে নানা কারণেই ময়ূর আজ মৃতপ্রায়। অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি
অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জনসংখ্যার আধিক্য ও পরিবেশ বিষয়ে অসচেতনতা, অপর্যাপ্ত পানিপ্রবাহে ময়ূরের জীবন এখন যায় যায়।

বর্ষায় ময়ূরের মূল ধারা পানির চাপ নিতে না পারায় তা নিয়ন্ত্রণে আশির দশকে রূপসার আলুতলা এলাকায় ১০ বেন্টের একটি জলকপাট নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। মূলত এর
পর থেকেই বিপন্ন হতে থাকে নদের অস্তিত্ব। জলকপাটের মাধ্যমে এর জোয়ার-ভাটা নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও বেশির ভাগ সময় তা বন্ধই থাকে। ফলে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
একটু বৃষ্টি হলেই নগরে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।

স্থানীয়রা জানান, পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ময়ূরের তলদেশে পলি জমে ধীরে ধীরে ভরাট হতে থাকে। প্রবাহ না থাকায় শুরু হয় দখল-দূষণের উৎসব। ইচ্ছেমতো ময়ূরের বুক দখল
করে প্রভাবশালীরা গড়েছেন স্থাপনা। ময়ূরের মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর আরো একটি বড় কারণ নালা-নর্দমা। নগরের গুরুত্বপূর্ণ ২২টির বেশি নালার মুখ গিয়ে পড়েছে ময়ূর নদে। ফলে
ময়লা-আবর্জনা বিষাক্ত করে তুলছে নদের পানি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক আরেফিন বাদল বলেন, ‘নদটি দূষণে মরণাপন্ন অবস্থা। মূলত অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই এর জন্য দায়ী।’ 

ময়ূর নদ দূষণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আবদুল খালেকও। তিনি জানান, ময়ূর নদ বাঁচাতে হলে একা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। একে বাঁচাতে বিভিন্ন
সংস্থা ও জনসাধারণের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

খুলনার জেলা প্রশাসক খন্দকার ইয়াসির আরেফীন বলেন, ‘অবৈধভাবে কেউ নদী দখল-দূষণ করলে তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এদিকে ময়ূর নদ রক্ষায় ২০১৪ সালে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নদ খনন করা হয়েছিল। তবে সে উদ্যোগ কাজে আসেনি। প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে গত ডিসেম্বরে আবারো নদ
খননের কাজ শুরু করেছে খুলনা সিটি করপোরেশন। পাশাপাশি নদটি ঘিরে নেয়া হয়েছে বেশকিছু পরিকল্পনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে নদের প্রাণ ফিরবে, কমবে খুলনা নগরের
জলাবদ্ধতা। খুলনার নাগরিক নেতারা যদিও বলছেন, সঠিক সিদ্ধান্ত, খননে অনিয়ম, দখল, পরিবেশ বিষয়ে অসচেতনতা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ না থাকা,
জবাবদিহির অভাবসহ নানা কারণেই ময়ূর নদ খননের সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে।

ময়ূর নদ খুলনা নগরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিক নেতারা জানান, ময়ূর নদ খননে বিলম্ব হওয়ার কারণ হিসেবে বর্ষা মৌসুমকে উল্লেখ করা হয়েছে। এ
কারণে নির্ধারিত সময়ে ওই কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আবারো বর্ষা মৌসুম সামনে রেখেই ওই খনন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ময়ূর নদ খনন
আবার আগের মতো হতে পারে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘ময়ূর নদের দুই পাড়ের অবৈধ দখলকারীরা এর অংশবিশেষ
ভরাট করে বাড়িঘর নির্মাণ করেছে। অবৈধ এসব স্থাপনা উচ্ছেদ ও সীমানা চিহ্নিত না করেই নদটি খনন করা হচ্ছে। খননের মাটি আবার পাড়ে রাখা হচ্ছে। এতে বর্ষায় ওই মাটি ধুয়ে
আবার নদে গিয়েই পড়বে।’

খুলনার পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘ময়ূর নদ খননের নামে শুধু টাকা তছরুফই
হচ্ছে। সুফল মিলছে না। একাধিকবার নদের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু আবারো সবকিছু দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাই আমাদের দাবি ছিল নদের অবৈধ স্থাপনা
উচ্ছেদ করে সিএস ম্যাপ অনুযায়ী সীমানা উদ্ধার করে পিলার দেয়া। সেই সঙ্গে শুধু নগর এলাকায় থাকা নদের অংশ খনন না করে রূপসার আলুতলা থেকে খনন করা। কিন্তু খুলনা
সিটি করপোরেশনের সেদিকে নজর নেই।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা সিটি মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, ‘ময়ূর নদ খনন করা হচ্ছে। এছাড়া নদের দুই পাড় বাঁধাই করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, মাঝেমধ্যে দুই পাড়ের
সংযোগ সেতু, বিনোদনের জন্য নৌকা চালানোর ব্যবস্থা, পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের দুটি দাতা সংস্থা এবং সরকার এসব
প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। ২০২৫ সালের মধ্যে বেশির ভাগ প্রকল্পের কাজ হয়ে যাবে। ময়ূর নদ খননকাজে কোনো গাফিলতি ও বাধা সহ্য করা হবে না। নকশা অনুযায়ীই নদ খনন করা
হবে।’
(পিএস/এএইচ)

Comment As:

Comment (0)